রাজশাহী প্রতিনিধি: বাড়ির পাশেই নিজের ও স্ত্রীর কবরের জন্য গোরস্থান তৈরি করেছিলেন মজিদ সরদার। তিন দিন পর সেই জায়গাতেই স্ত্রী জান্নাতুল বেগমের দাফনের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে তাঁকে। ছেলের ধারালো বটির কোপে নিহত হয়েছেন জান্নাতুল। স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন মজিদ সরদার।
বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১টার দিকে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের মৌগাছি সরদারপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত জান্নাতুল বেগমের বয়স ৫৫ বছর। তাঁর স্বামী মজিদ সরদার রামেক হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় তাঁদের ছেলে আমিনুল ইসলাম (২৭)কে ঘটনাস্থল থেকে আটক করেছে পুলিশ।
পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, আমিনুল দীর্ঘদিন ধরে গাঁজা ও অন্যান্য মাদক সেবন করতেন। পরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদক সেবনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তিন দিন আগে তৈরি করেছিলেন গোরস্থান
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) মজিদ সরদার বাড়ির সঙ্গে নতুন একটি গোরস্থান তৈরি করেন। সেখানে তিনি ও তাঁর স্ত্রী মারা গেলে পাশাপাশি দাফন করার ইচ্ছার কথাও স্থানীয়দের জানিয়েছিলেন।
কিন্তু গোরস্থান তৈরির মাত্র তিন দিনের মাথায় ছেলের হাতে নিহত হলেন তাঁর স্ত্রী। আর স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন মজিদ নিজেই।
বটির কোপে মায়ের মৃত্যু
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে,
মাদক সেবনে বিরত থাকতে বলায়
ঘটনার রাতে আমিনুল ধারালো বটি নিয়ে তাঁর মা জান্নাতুল বেগমের ওপর হামলা চালান। বটির কয়েকটি কোপ তাঁর দুই হাঁটুর নিচে লাগে। এতে রক্তনালি কেটে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়।
গুরুতর অবস্থায় জান্নাতুলকে নওদাপাড়া এলাকার ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে আমিনুলের বাবা মজিদ সরদারও বটির আঘাতে গুরুতর আহত হন। তাঁকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে মোহনপুর থানায় রেখেছে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য রামেক হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হবে।
চিকিৎসার পাশাপাশি চলছিল কবিরাজি
আমিনুলের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন বলেন, তাঁর স্বামীর মস্তিষ্কে সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চললেও মাঝেমধ্যে তাঁর আচরণে পরিবর্তন আসত। তিনি ধূমপান ও গাঁজা সেবন করতেন। আমিনুল ও মাহমুদার বিয়ে প্রায় ছয় বছর আগে। তাঁদের তিন বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
আমিনুলের শ্বশুর আজিম উদ্দিন বলেন, তাঁর জামাই প্রায় চার বছর ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসকের পাশাপাশি প্রায় এক বছর ধরে স্থানীয় এক কবিরাজের কাছেও ঝাড়ফুঁক ও গাছগাছড়ার মাধ্যমে চিকিৎসা চলছিল।
স্থানীয় ভ্যানচালক রানা দাবি করেন, আমিনুল নিয়মিত গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করতেন। মাদক সেবন বন্ধ থাকলে তিনি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতেন বলেও দাবি করেন তিনি। এসব তথ্য অবশ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ছয় ঘণ্টা পর পুলিশকে খবর
ঘটনাটি রাত ১টার দিকে ঘটলেও পুলিশকে খবর দেওয়া হয় সকাল ৭টার দিকে। অর্থাৎ প্রায় ছয় ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাটি জানতে পারে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে পুলিশের টহল ও জনসম্পৃক্ততা নিয়ে সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, থানার আগের কর্মকর্তারা গুরুতর ঘটনা ঘটলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেন। বর্তমান ওসির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ কম থাকায় হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ জানতে পেরেছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে দেরিতে খবর পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সাবিনা ইয়াসমিন জানান, এ ঘটনায় ইতোমধ্যে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে। তিনি বলেন, ছেলের হাতে মায়ের হত্যার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের একটি দৃষ্টান্ত। পুলিশ চুরি, ডাকাতিসহ যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে নিয়মিত টহল ও দায়িত্ব পালন করে। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক।
‘এজাহার হলে কারণ জানা যাবে’
মোহনপুর থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। এজাহার হলে জানা যাবে কেন, কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে।’
মাদক সেবনের কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।’ ঘটনার আগে আমিনুল মাদক সেবন করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন কি না জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘বিষয়টি জানি না।’
পুলিশ জানিয়েছে, আমিনুলকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ, মাদক সেবনের অভিযোগ এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না-এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এ জাতীয় আরো খবর..