নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় এক ঐতিহাসিক ও দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা আইনজীবী সমিতি (ঢাকা বার)। জঘন্য এই অপরাধের মামলার আসামিপক্ষে ঢাকা বারের কোনো সদস্য আইনি সহায়তা দেবেন না বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আজ শুক্রবার (২২ মে) সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কালাম খান। তিনি তার ফেসবুক আইডি হতে পোস্টে জানান, ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সমিতির কোনো বিজ্ঞ আইনজীবী রামিসা হত্যা মামলার আসামির পক্ষে মামলা পরিচালনায় অংশ নেবেন না। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রুখতে এবং এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও কঠোর বিচার নিশ্চিত করতেই আইনজীবীদের এই ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত।
ঢাকা বারের আইনজীবী এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পর "তথ্য প্রকাশ"-এর পক্ষ থেকে ঢাকা বারের সকল আইনজীবীদের প্রতি যথাযথ সম্মান, শ্রদ্ধাপূর্ণ সাধুবাদ ও আন্তরিক অভিনন্দন! পেশাগত গণ্ডির ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর এই অনন্য দৃষ্টান্ত সত্যিই প্রশংসনীয়। দেশে যেন ভবিষ্যতে সর্বক্ষেত্রে এমন সুষ্ঠু ও ন্যায়ভিত্তিক ধারা অব্যাহত থাকে। তবেই সাধারণ জনগণ এমন জঘন্য অপরাধীদের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবে, সমাজে অপরাধের প্রবণতা কমবে এবং এই নরপিশাজরা দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে।
সহপাঠী ও স্বজনদের চোখের জল আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলমান তীব্র প্রতিবাদের মুখে ঢাকা বারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার প্রাপ্তির পথকে আরও সুগম করল বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
কেননা, ঘটনাটি অত্যান্ত জঘন্য ও বিকৃত মানসিকতার! রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি সোহেল রানা আদালতে হাজির হয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছেন। মাদকাসক্তি, বিকৃত যৌন লালসা এবং অপরাধ ধামাচাপা দিতে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নৃশংসতার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে পুলিশের তদন্ত ও আসামির জবানবন্দিতে।

গত ১৯ মে (মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পল্লবীর সেকশন-১১, ব্লক-বি এলাকার একটি বহুতল ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে এই ঘটনা ঘটে। ওই তলার পাশাপাশি তিনটি কক্ষে তিনটি পরিবার বসবাস করতো। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মূল আসামি সোহেল রানা জানায়:
বিকৃত লালসা ও ধর্ষণ: ঘটনার সময় ইয়াবা আসক্ত সোহেল রানা ঘরের দরজা খোলার পর প্রতিবেশী শিশু রামিসাকে দেখতে পায়। তখন তার মধ্যে বিকৃত যৌন লালসা জেগে উঠলে সে কৌশলে শিশুটিকে নিজের ঘরে ডেকে নেয়। এরপর তাকে বাথরুমে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।
হত্যাকাণ্ড: ধর্ষণের পর শিশু রামিসা বিষয়টি তার বাবা-মাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সোহেল। অপরাধ গোপন করার জন্য সে রামিসাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
লাশ গুমের চেষ্টা ও স্ত্রীর সহযোগিতা: হত্যাকাণ্ডের পর সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার বিষয়টি জানতে পারেন। স্বামীকে বাঁচাতে এবং লাশ গুম করতে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তারা ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার মাথা কেটে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। এছাড়া তার হাত আংশিক কেটে ফেলাসহ শরীর ক্ষতবিক্ষত করা হয়। পরে রক্তমাখা দেহটি বাথরুম থেকে এনে শয়নকক্ষের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়।
পল্লবী ও মিরপুরে বিক্ষোভ: এলাকাবাসী ও রামিসার সহপাঠীরা মিরপুর গোলচত্বর এবং পল্লবী থানার ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং খুনিদের দ্রুত ফাঁসির দাবি জানান।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ: আজিমপুর ক্যাম্পাসের ফটকে ‘অভিভাবক ও শিক্ষার্থী নেটওয়ার্ক’-এর ব্যানারে মানববন্ধন করা হয়। বক্তারা দেশে চলমান 'বিচারহীনতার সংস্কৃতি'র অবসান দাবি করেন।
বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচি: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তর (মহিলা বিভাগ) মিরপুরে মানববন্ধন ও মিছিল করে ১২ দফা দাবি পেশ করে। এছাড়া জাতীয় শিশুকিশোর সংগঠন ‘ফুলকুঁড়ি আসর’ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শত শত শিশু-কিশোরকে সাথে নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করে। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে:

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্য: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, রামিসা হত্যার দ্রুত বিচারের মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে।
বিশেষ বেঞ্চ গঠনের আবেদন: শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলোর ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের আবেদন জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ: ঘটনার তীব্রতা বিবেচনা করে ‘আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি’-র চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন, যেখানে বিরোধী দলসহ সবাইকে সাথে নিয়ে সশরীরে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
সহপাঠী, শিক্ষক আর স্বজনদের কান্না আর 'উই ওয়ান্ট জাস্টিস ফর রামিসা' স্লোগানে এখনো উত্তাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ রাজপথ। ঘরে-বাইরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আর কোনো বিলম্ব না করে এই জঘন্য অপরাধের দ্রুত ও কঠোরতম শাস্তি দেখতে চায় দেশের মানুষ।