রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) বিদ্যুৎ বিভাগের একটি বহুল আলোচিত মামলায় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খালাস পেয়েছেন। তবে এই মামলাকে ঘিরে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল—বিশেষ করে নিম্নমানের সড়কবাতি সরবরাহের অভিযোগ আড়াল করতে ইচ্ছাকৃতভাবে মামলা করা হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাসিকের বিদ্যুৎ বিভাগের বেশিরভাগ কাজ পেত ‘হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আশরাফুল হুদা টিটো তৎকালীন মেয়রের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, চীন থেকে আমদানি করা প্রায় দেড় হাজার সড়কবাতি সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও এসব বাতির ব্যালাস্ট ছিল নিম্নমানের, ফলে স্থাপনের পরপরই একের পর এক বাতি বিকল হতে শুরু করে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ ঠিকাদারের বিল আটকে দেন।
এরই মধ্যে ২০২০ সালের ১৯ মে রাসিকের পক্ষ থেকে থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। এতে অভিযোগ করা হয়, কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ইচ্ছাকৃতভাবে সড়কবাতি নষ্ট করে করপোরেশনের ক্ষতি করছেন। তবে অভিযুক্তরা শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন, নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়টি চাপা দিতেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে।
প্রথমে মামলায় স্ট্রিট লাইট মিস্ত্রি মিজানুর রহমান শাহিন, উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল হাসান এবং মিস্ত্রি ইব্রাহিম হোসেনকে আসামি করা হয়। পরবর্তীতে অভিযোগপত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এ মামলাকে ঘিরে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার চাপ প্রয়োগের অভিযোগও ওঠে। কয়েকজন অস্থায়ী কর্মচারী অভিযোগ করেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে এবং চাকরি থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। বর্তমানে তারা পুনর্বহালের দাবিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ এবং পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে। দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ১৩ মার্চ মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক আব্দুল কুদ্দুস রায় ঘোষণা করে সব আসামিকে খালাস দেন।
এদিকে মামলার প্রভাব পড়েছে অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত জীবনেও। অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদের পেনশন প্রাপ্তি বিলম্বিত হয়েছে। পাশাপাশি সাময়িক বরখাস্ত থাকা কর্মকর্তাদের বকেয়া সুবিধাও এখনো পরিশোধ হয়নি।
এ বিষয়ে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, আদালতের রায় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাসিকের সড়কবাতি ও ফ্লাডলাইট স্থাপনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নগরীর ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ফ্লাডলাইট স্থাপন প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত চালাচ্ছে।
দুদকের রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল বারী জানিয়েছেন, ফ্লাডলাইট প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। তবে অন্যান্য প্রকল্পের বিষয়ে এখনো তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক তথ্য আসেনি।
যদিও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, পুরো ঘটনাকে ঘিরে জনমনে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..